27/04/2019
বাঙ্গালির মুক্তির সনদ
বাঙ্গালির ম্যাগনাকার্টা
ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবির ৫১ বছর পূর্তি।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবিসমূহ :
প্রস্তাব - ১ :
শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি:
দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারনের সরাসরি ভোটে।
প্রস্তাব - ২ :
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা:
কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল মাত্র দু'টি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে- যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।
প্রস্তাব - ৩ :
মুদ্রা বা অর্থ-সমন্ধীয় ক্ষমতা:
মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দু'টির যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারেঃ-
(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দু'টি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।
অথবা
(খ)বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল মাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাব - ৪ :
রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা:
ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব - ৫ :
বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:
(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।
(ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোন বাধা-নিষেধ থাকবে না।
(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
প্রস্তাব - ৬ :
আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা:
আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
৬ দফা যে আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই তো একের পর এক আন্দোলন হতে লাগলো। আর শেষমেশ যখন শেখ মুজিবও ৬৯-এর নির্বাচনে জিতেই গেলেন, তারপরও তাঁকে পাকিস্তানিরা ক্ষমতা দিলো না, তখনই তো আমরা বুঝলাম, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো গতি নেই। ওই বর্বর পাঞ্জাবি পাকিস্তানি মিলিটারিদের সঙ্গে এক দেশে আমরা কখনোই থাকতে পারবো না। আমাদের বাপ-দাদারা হাতে রাইফেল, বন্দুক, গ্রেনেড, যা পেলেন, তাই নিয়ে যুদ্ধের সেই ভয়াল ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আর ৯ মাসের ভীষণ গৌরবময় আর ¯^জন হারানোর ভীষণ দুঃখের এক মুক্তিযুদ্ধ শেষে ¯^স্বাধীন হলো আমাদের এই সবুজ দেশটা। তোমরা কি এটা জানো, ৭ জুন ৬ দফা দিবস হিসেবে পালন করা হয়? যারা জানতে না, তারাও তো এবার জেনে গেলে! তার আগে আগে চলো আমরা ৬ দফা আন্দোলনের ইতিহাসটাই জেনে আসি।
ব্রিটিশরা যাওয়ার আগে তো ভারত আর পাকিস্তান নামের দুটো দেশ বানিয়ে গেলো, কিন্তু সেই পাকিস্তান দেশটা তেমন সুবিধের হলো না। কী করে হবে বলো! একটা দেশের দুটো অংশের মাঝে ১৫০০ মাইল জুড়ে যদি আরেকটা দেশের জমি থাকে, দেশের এই অংশ আর ওই অংশে যোগাযোগ কী করে হয় বলো? আর পশ্চিম পাকিস্তানিরা তো শুরু থেকেই এমন ভাব করতে শুরু করলো, যেন বাঙালিরা খাঁটি মুসলিমই না! শুধু ওরাই খাঁটি মুসলিম, আর তাই পাকিস্তান দেশটাও ওদেরই। আমাদেরকে দয়া করে থাকতে দিয়েছে আরকি! ভাষার কথাই ধরো না। দেশের বেশিরভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, আর রাষ্ট্রভাষা হবে কিনা উর্দু, যে ভাষায় দেশের অর্ধেকের অর্ধেক লোকও কথা বলে না! আর যায় কোথায়। বাঙালিরা এমন আন্দোলন করলো, শেষ পর্যন্ত ওরা সেটা মেনে নিতে বাধ্য হলো। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বলা হলো, উর্দু ও বাংলা দুটোই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।
তো ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান হলো। কিন্তু ওই যে, পশ্চিম পাকিস্তানের মিলিটারি আর কিছু খারাপ নেতাদের লোভ ছিলো অনেক বেশি। যেই ওরা একটু সুযোগ পেলো, ওমনি দেশে সামরিক শাসন জারি করে দিলো। মানে, মিলিটারিদের শাসন। ওরা যা বলবে, তাই হবে। সেটা ১৯৫৮ সালের কথা। পাকিস্তানের লোভী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা, আর্মির প্রধান আইয়ুব খানকে ক্ষমতায় নিয়ে আসলেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি কি কখনো ভালো হয়? মীর জাফরের কথা মনে নেই? আইয়ুব খানও কয়দিন পরে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিলো। আর নিজে বসলো ক্ষমতায়।
এই আইয়ুব খান কিন্তু খুবই ধুরন্ধর ছিলো। সে কী করলো জানো? এমন কিছু লোক দেখানো কাজ করতে লাগলো, যাতে মানুষ তাকে পছন্দ করতে শুরু করে। যেমন ধরো, দোকানদার-ব্যবসায়ীদের ধরে বেঁধে জোর করে কম দামে জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাধ্য করতে লাগলো। দুর্নীতি দমন করছে এমন কথা বলে লোক দেখানোর জন্য কিছু লোকজনকে ধরে বেঁধে অহেতুক মারপিট আর ধরপাকড় করতে লাগলো। আর বলে বেড়াতে লাগলো, দেশের দুরবস্থা দূর করতেই তিনি এসেছেন! দেশের অবস্থা ভালো হলেই আবার আর্মিতে ফিরে যাবে সে।
এর কিছুদিন পরে আইয়ুব খান দেশে গণতন্ত্র প্রবর্তন করলো। মানে ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচন করা, দেশের সবাইকে ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বললাম না, আইয়ুব খান ছিলো খুবই ধুরন্ধর এক লোক। সে বললো, পাকিস্তানের সব লোক তো আর ইউরোপ-আমেরিকার লোকেদের মতো শিক্ষিত নয়। তাই ওদের গণতন্ত্রও আমাদের দেশে চলবে না। পাকিস্তানের জন্য দরকার নতুন ধরনের গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্রের নাম সে দিলো বেসিক ডেমোক্রেসি বা মৌলিক গণতন্ত্র। এখানে পাকিস্তানের দুই অঞ্চল থেকে ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচিত হবে। ভোট দিতে পারবে এই ৮০ হাজার লোকই। বাকিরা কেউ-ই ভোট দিতে পারবে না। কী আজব কথা একবার চিন্তা করো! তোমার বাবা যদি ওই ৮০ হাজার লোকের কেউ না হন, তিনিও তার ভোট দিতে পারবেন না! আর এমনি করে এক আজব পদ্ধতিতে নির্বাচন করে দেশের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বনে গেলো সে। পাকিস্তানের ১৩ কোটি লোকের মধ্যে মাত্র ৮০ হাজার লোক নির্বাচনে ভোট দিলো, আর সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি হয়ে গেলেন দেশের সকলের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট! এর চেয়ে অদ্ভুত কথা কি কখনো শুনেছো?
যারা এতেই খুব অবাক হয়ে গেছো, তারা একটু নড়ে চড়ে বসো। কারণ, ওই নির্বাচন তো ছিলো কেবল শুরু। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই আইয়ুব খান আগের সংবিধান বাতিল করে এক নতুন সংবিধান প্রণয়ন করলো। আর তার মাধ্যমে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের সকল ক্ষমতা নিয়ে নিলো নিজের হাতে। আর রাজনীতিবিদরা যাতে কিছু করতে না পারে, তাই রাজধানী করাচি থেকে সরিয়ে নিলো ইসলামাবাদে। কারণ, ইসলামাবাদের পাশেই রাওয়ালপিন্ডি, সামরিক বাহিনীর বা আর্মিদের ঘাঁটি। ওখানে বসে তুমি যা-ই করবে, খবর চলে যাবে আর্মির হেডকোয়ার্টারে। যখন দরকার পড়বে, তখনই চলে আসবে হাজার হাজার আর্মি।
এই অপশাসন কি আর মানুষ বসে বসে দেখবে? কখনোই না। তখনকার বলিষ্ঠ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তো এতদিন জেলে ছিলেন। সংবিধান প্রণয়নের পর তিনি জেল থেকে ছাড়া পেলে সবগুলো রাজনৈতিক দল নিয়ে তিনি একটা জোট গঠন করলেন, নাম দিলেন গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। কিন্তু পরের বছরই তিনি মারা যান। ফলে এই জোটও আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়ে। এবার সংগঠিত হতে থাকে আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগকে তখন নেতৃত্ব দেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে আবারো প্রহসনের নির্বাচন হয়। প্রথমে আওয়ামী লীগ নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষমেশ সবগুলো বিরোধী দল মিলে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলাফল হয় একইÑ আইয়ুব খান বিশাল ব্যবধানে জয় লাভ করে। আসলে ওই ৮০ হাজার ভোটারদের তো আইয়ুব খান একরকম কিনেই রেখেছিলো। ওদের ভোটের নির্বাচনে আইয়ুব খান না জিতলে কে জিতবে!
ভারত-পাকিস্তান ভাগ করার সময় ব্রিটিশরা কিন্তু একটা বিশাল ঝামেলা পাকিয়ে রেখে চলে গেছে। কাশ্মীরকে তারা না দিয়েছে পুরোপুরি পাকিস্তানকে, না দিয়েছে পুরোপুরি ভারতকে। আসলে কাশ্মীরের বেশিরভাগ মানুষই মুসলমান। কিন্তু রাজা আবার হিন্দু। আর তাই ওখানকার মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে চাইলেও রাজা চায় ভারতের সঙ্গে থাকতে। আর এই নিয়ে তো দুই দেশের মধ্যে টানাটানি চলছিলো সেই ’৪৭ সাল থেকেই। আর তার ফলাফল হিসেবে ’৬৫ সালে এসে এই দুই দেশের মধ্যে এক বিশাল যুদ্ধই লেগে গেলো। ভারতের সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সীমানা অতিক্রম করে লাহোরের পথে এগোতে লাগলো। আর ওরা যেভাবে এগুচ্ছিলো, লাহোর ওরা ঠিকই দখল করে নিতো, যদি বাঙালি যোদ্ধারা অসম সাহসে ওদের রুখে না দিতো। টানা ১৭ দিন ধরে চললো ভয়ানক যুদ্ধ। অবশেষে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করলে যুদ্ধ থামলো। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চুক্তি হলো যে, কাশ্মীরের সমস্যা নিয়ে আর যাই করা হোক, যুদ্ধ করা চলবে না।
এই চুক্তি করে কিন্তু আইয়ুব খান পড়লো গ্যাঁড়াকলে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা তো তবু এতোদিন ওর পক্ষে ছিলো। এবার ওরাও গেলো ক্ষেপে। ভারতের সেনাবাহিনী তো ওদের অনেক ক্ষতি করেছিলো। তার কোনো প্রতিশোধ না নিয়ে প্রেসিডেন্ট কিনা যুদ্ধ না করার চুক্তি করে বসলো!
আর এই যুদ্ধের ফলে সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা হলো আমাদের, মানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেখা গেলো, আমাদের সীমান্ত একেবারেই অরক্ষিত। ভারত যদি একবার শুধু চিন্তা করতো, পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পুরো পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নেবে, তাহলেই আমরা দখল হয়ে যেতাম! আর তাই এই চুক্তি হওয়াতে আমাদের দেশের মানুষ খুবই খুশি হলো। কিন্তু যুদ্ধের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের যতো ক্ষতি হলো, সব ক্ষতি পুষিয়ে দেবার দায়িত্ব পড়লো আবার আমাদেরই কাঁধে! অথচ সেই যুদ্ধে কিন্তু আমাদের কোনো লাভও হয়নি, ক্ষতিও হয়নি। শুধু শুধু আমাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ট্যাক্স নেয়া হলো। শুধু ট্যাক্সই নয়, এবার সত্যি সত্যিই বাঙালিদের উপর অত্যাচার শুরু হয়ে গেলো।
সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তান, মানে বাংলাদেশ তো অনেক আগে থেকেই আইয়ুব খানের ওপর বিরক্ত, এবার শান্তি চুক্তি করার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরাও তার প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠলো। এমন সময়, ১৯৬৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে লাহোরে পাকিস্তানের সবগুলো রাজনৈতিক দলের একটা কনফারেন্স হলো। আর সেই কনফারেন্সেই শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি ঘোষণা করলেন। পরে বাংলাদেশে এসে ১৮ মার্চ তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন।
৬ দফার প্রথম দাবি ছিলো গণতান্ত্রিক সরকার। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র নয়, সত্যিকারের গণতন্ত্র। দুই পাকিস্তানে দুইটি আঞ্চলিক সরকার থাকবে। আর থাকবে একটা কেন্দ্রীয় সরকার। এই কেন্দ্রীয় সরকার শুধু প্রতিরক্ষা আর বৈদেশিক নীতির বিষয়গুলো দেখবে। বাকি সবকিছুর দেখভাল করবে আঞ্চলিক সরকার।
আবার দেখো না, পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের টাকা কেমন করে ওদের দেশে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছিলো আর আমাদের টাকায় ওদের শহরগুলো তৈরি করছিলো! যুদ্ধের পরেই যেমন, ওদের শহরের ক্ষতি হয়েছে তাই আমাদের কাছ থেকে টাকা তুলেছে। আর আমাদের শহরগুলোর উন্নতি করার বেলায় দিতো কচুপোড়া। তাই শেখ মুজিব প্রস্তাব করলেন, দুই অঞ্চলের মুদ্রা হবে আলাদা আলাদা। আর দুই অঞ্চলের জন্য থাকবে আলাদা আলাদা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে তুমি চাইলেও বাংলাদেশের টাকা পশ্চিম পাকিস্তানে নিতে পারবে না।
আমাদের ট্যাক্সের টাকা যাতে আমাদের জন্যই ব্যয় করা হয়, তাই তিনি বললেন, ট্যাক্স আদায় করবে আঞ্চলিক সরকার। আর সেখান থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ দিবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। আবার বিদেশ থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে, সেটারও আলাদা আলাদা হিসাব রাখা হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা যেটা, বাংলাদেশের জন্য একটা আলাদা মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করতে হবে। কেন? মনে নেই, কাশ্মীর যুদ্ধের সময় কি হয়েছিলো? আমাদের দেশের তো তখন কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ছিলো না!
৬ দফার দাবিগুলো ছিলো জনগণের হৃদয়ের দাবি। আর তাই মানুষ এগুলো এতোই পছন্দ করলো, আইয়ুব খান তো ভীষণই ভয় পেয়ে গেলো। ভাবলো, এই বুঝি তার দিন ফুরোলো। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন নামে এক অদ্ভুত আইন করেছিলো আইয়ুব খান। সেই আইনে এবার শেখ মুজিব সহ আরও অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা ও ছাত্রদের গ্রেপ্তার করা হলো। তাতে মানুষের মনের আগুন তো কমলোই না, উল্টো যেন আগুনে ঘি পড়লো। এমন অবস্থায় আওয়ামী লীগ ৭ জুন সারা দেশে হরতাল ঘোষণা করলো।
৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল পালিত হতে লাগলো। তখন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ অংশের) গভর্নর ছিলো আইয়ুব খানের পছন্দের লোক মোনেম খান। সে যখন দেখলো, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সারা দেশের মানুষও হরতাল পালন করছে, তার আর সহ্য হলো না। মানুষের উপর পুলিশ আর ইপিআরদের লেলিয়ে দিলো সে। আর তাদের বেপরোয়া গুলিতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মারা গেলো নাম না জানা অসংখ্য মানুষ। দেশের মানুষ এবার বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। ৬ দফার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে নিহত হওয়া এইসব লোকদের স্মরণ করেই প্রতি বছর ৭ জুন পালন করা হয় ৬ দফা দিবস।
তাদের মৃত্যুতে অবশ্য শেখ মুজিবসহ অন্যান্য বন্দীদের মুক্তি হয়নি। তবে আন্দোলন তীব্রতর হয়। আর এই আন্দোলন থামাতে ধুরন্ধর আইয়ুব খান এক কূটচাল চালে। শেখ মুজিবসহ ৩৫ জন বন্দীর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা করে সে। সে ভেবেছিলো, এতে মানুষ শেখ মুজিবসহ সবাইকে দেশদ্রোহী ভেবে তাদেরকে আর সমর্থন করবে না। বরং দেশদ্রোহীদের শাস্তি দেওয়ায় তাকে সমর্থন করবে। কিন্তু তার সে আশায় গুঁড়ে বালি দিয়ে তার সব ষড়যন্ত্র আদালতে ধরা পড়ে যায়। উল্টো এই ষড়যন্ত্রই তার পতনের কারণ হয়ে দাড়ায়। ষড়যন্ত্রটি পরিচিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে। কী, এবার তো চিনতে পেরেছো, নাকি? সেই গল্পও শুনবে? একদিনে আর কতো গল্প শুনবে বলো? আজ এইটুকুই থাক। ওই ষড়যন্ত্রের গল্প আর ষড়যন্ত্র শেষে শেখ মুজিবের আবার নায়ক হয়ে ওঠার গল্প না হয় আমরা আরেক দিন শুনবো, কেমন?