23/03/2021
ই- কমার্সের এপিঠ ওপিঠ !!
বিভিন্ন জায়গায় ইদানিং দেখছি লেখালেখি হচ্ছে অমুক পেইজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে, অমুক সাইট ডেলিভারি দিতে দেরি করেছে। এই অভিযোগ গুলো আগেও ছিল। তবে আগে এর চাইতে আরো একটা অভিযোগ বেশি শোনা যেত। তাহলো ছবিতে এক প্রোডাক্ট দেখায়ে অন্য প্রোডাক্ট গুছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসলে এই ধরনের অভিযোগ সব দেশেই কম বেশি আছে। তবে এটা কেন আমাদের দেশে বেশি শোনা যায়? নিচের লেখাগুলোতে এবিষয়ে আমি কথা বলবো।
আমি মনে করি, একজন বিক্রেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার দোকান। ই- কমার্স ব্যাবসায়ীদের দোকান বলতে ওয়েবসাইটকে বোঝায়। আমাদের দেশে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা আছেন যারা ফেসবুক পেইজ দিয়ে ব্যাবসা করেন। প্রথমত তাদের ওয়েবসাইট ব্যাপারটায় বেশ এলারজি আর দ্বিতীয়ত আমাদের দেশে ফেসবুকেই
মানুষ বেশি কিনতে অভ্যস্ত তাই ওয়েবসাইট বানানো আর হয়ে ওঠে না।
তো যাইহোক আমি আসি আমার সমস্যায়। মাস দুয়েক আগের কথা, একজন আর্মি রিটারড পারসোন এর সাথে আমাদের বেশ কিছু সময় কথা হল পেইজের ম্যাসেজে। তার পছন্দ অপছন্দ আমরা না চাইতেও জেনে গেলাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের পেইজের যিনি ম্যসেজ পার্টটা দেখে ক্লান্ত হয়ে বলল, স্যার আমরা অর্ডারটি পাঠিয়ে দেই। কোন প্রব্লেম থাকলে জানাবেন। সাধারণত বিকেল ৩ টার আগে প্লেস হওয়া সব অর্ডার আমরা পরদিন ডেলিভারি দিতে পারি। এই ভদ্রলোকের সাথে আমাদের চ্যাট হয়েছে রাত ৩টার দিকে ঘন্টা খানেকের মত। তো স্বাভাবিক ভাবেই তিনি পাবেন তার পরদিন। যেতে কেন দেরি হচ্ছে এই বিষয়ে আমরা যতই ভালোভাবে বুঝাইছি লাভ হয়েছে বলে মনে হল না। তিনি শর্ত জুড়ে দিলেন, মাগরিবের নামাযের পর অমুক মসজিদের সামনে থেকে কালেক্ট করতে পারবেন। আমরা কুরিয়ার কোম্পানিকে সেভাবেই বলে দিলাম। যা ভাবছিলাম তাই, ভদ্রলোক আমাকে ফোন দিলেন। তিনি নাকি মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি ফোন দিলাম কুরিয়ারে। তারা কিছুক্ষন অপেক্ষা করতে বললেন। ভদ্রলোক আমাকে ফোন দিয়ে জানালেন মশার কামড় খাচ্ছেন। আমি ফোন দিলাম কুরিয়ারে। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর ভদ্রলোক কে বললাম আগামীকাল দেওয়ার চেষ্টা করবো এবং যথা সম্ভব দুঃখ প্রকাশ করলাম। কুরিয়ারকে আমি ভালো করে বলে দিয়েছিলাম টাইম আর প্লেস। তারা ঠিক টাইমে উপস্থিত হলো। তারপরও আমার প্রোডাক্ট ফেরত আসলো। কারন হল, এটা প্লাস্টিকের জারে দেওয়া হয়েছে। উনি নাকি কাচের জারে নেন সব জায়গা থেকে (মিক্সড বাদাম)। যাইহোক এটা আমাদের ভুল। যিনি ম্যাসেজ দেন তাকে জানিয়ে দেওয়া উচিত ছিল প্লাস্টিক জারে যাবে। দুইদিন ধরে ডেলিভারি ম্যানকে ঘুরানোর পরে কোন টিপস কিংবা ডেলিভারি চার্জ দেওয়া তো দুরের কথা উল্টো আমাদের বেশ কথা শুনিয়ে দিলেন।
এই শীতের কথা। সিলন ন্যাচারাল নারিকেল তেল স্টক করছিলাম কিছু। বুস্ট করার ফলে কিছু নতুন কাস্টমার আসলো। এর মধ্যে একজনের কথা ভুলতে পারি না আমি। কথা মত তেল পৌঁছে গেল তার কিচেনে। অভিযোগ জারের মুখ ইন্ট্যাক্ট ছিল না। রিটার্ন আনলাম। আবার পাঠালাম। রিটার্ন খরচ চেয়ে মহা পাপ করেছিলাম আমি। পকেটের টাকা কুরিয়ার খরচ দিয়ে আবারো পাঠালাম। এবারের অভিযোগ তেল বসা না। এটা ঠিক যে কিছু তেল বসা ছিলো কিছু তেল বসা ছিলো না। আমি নিজেও জানি না এর রহস্য কি। যাইহোক আমরা একি পাপ আবারো করলাম। বললাম অন্তত একটা ডেলিভারি চার্জ দিতে। উনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন খারাপ প্রোডাক্ট দিয়েছি আবার চার্জ চাচ্ছি। বাধ্য হয়ে কি আর করা ফেরত আনলাম নারিকেল তেলটি। যদি আমার সার্ভিসের দরুন ই- কমার্সের প্রতি খারাপ মনোভাব একটু হলেও দূর হয়!!
এই দুইটি উদাহরণ ছাড়াও আরো অনেক উদাহরণ আছে ই- কমার্স থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য একজন বিক্রেতা হিসেবে। কথায় কথায় মানুষজন বলে ভোক্তা অধিকার আইনে কমপ্লেইন করবে। ভাই মনে হচ্ছে পাপ করতে এসেছি উদ্যোক্তা হতে যেয়ে। কিছু কিছু এমন ও আছে টাকা রিটার্ন করার পরে ডেলিভারিম্যান পাঠিয়েছি প্রোডাক্টটা ফেরত আনতে। ওমা ফোনই ধরতে চায়না অনেকে। যদিওবা কেউ কেউ রিটার্ন করে তো সেই প্রোডাক্ট আর প্রোডাক্ট থাকে না। পুরাই জগা খিচুড়ি। যাইহোক এতক্ষন ধরে ই- কমার্সের এপিঠের গল্প বললাম। চাড়াই উত্তরাই সব জায়গাতেই পার হতে হবে। সহজে সাফল্য আসবে না। এটা আমরা যারা ই- কমার্স আর্মি আছি সবাই জানি। মার্কেটের এই অবস্থায়ও দেড় বছর টিকে থাকতে পেরে আমরা গর্বিত।
এবার আসি ওপিঠের গল্পে। আমি সবে শুরু করেছি ই- কমার্স সরি এফ- কমার্স। সব কিছু তখনও ভালোমত বুঝে উঠতে পারিনি। পেজ খুললাম। কিন্তু সেল নাই। বুঝছিলাম বুস্ট না করলে সেল পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন মানুষকে হায়ার করতে থাকলাম বুস্টিং এর জন্য। একবার এক ভাইজান কে দিলাম ১০ ডলার বুস্ট করতে। ভাই আমার বুস্ট সেট করছে মাত্র ২ ডলার। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার পেজ গায়েব। কত কিছু করলাম, কত মানুষকে জিজ্ঞেস করলাম। কেউ কিচ্ছু করতে পারলো না। খুব কস্ট পেয়েছিলাম ওইবার। আমার আসলে কি করা উচিত ছিল ঐ ভাইকে? আমি কিছুই করিনি। খোজ নিয়ে জানলাম সে একটা ফ্রড। নতুন আর একটা পেইজ করতে হল আমাকে। এখন বুস্ট করাই বিভিন্ন এজেন্সি থেকে। তবে আমার সবচেয়ে বেশি টাকা মার গেছে বুস্ট করতে যেয়ে। এই সব ঝামেলা থেকে বাচতে একসময় ডিজিশন নিলাম কার্ড নেয়ার। ডুয়েল কারেন্সি কার্ড নেওয়া এত সহজ নয়। আমি টাকা দিলাম একটা এজেন্সিকে কার্ড নেওয়ার জন্য। ১০০ টাকা পাঠাতে হবে তারপর এক্টিভ হলে আরো ৭০০ পাঠাতে হবে। আমি খুশি, ৮০০ টাকা একটু বেশি হলেও অন্তত আমি নিজে বুস্ট করতে পারব এখন থেকে। কিন্ত না এখানেও আবার শিকার হলাম ধোঁকাবাজির। যে আইডি পাসওয়ার্ড দিয়েছে তারা সব ভুল। আমি তাদেরকে নক করলাম সমাধানের জন্য। টাইম নিল দুইদিন। ফোন দেই ফোন ধরে না। দিতেই থাকি ফোন, একসময় ফোন ধরে। বলে আমি নাকি বারবার ট্রাই করতে গিয়ে ডিজাবল করে ফেলছি। কি হাস্যকর! একবার ঢুকতে পারলেও না হয় এই কথা মানা যেত।
এবার আরো একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করা যাক। বিভিন্ন পারপাসে আমার ব্যানার দরকার পড়ে প্রোমশনের জন্য। যারা এই কাজ গুলো করে ৫০% এডভান্স ছাড়া কাজ শুরু করে না। এমন এজেন্সি আমি খুব কমই পেয়েছি যারা কাজ শেষ করে টাকা চায়। তো ৫০% এডভান্স করার পর ধরেন কাজটা পছন্দ হইলো না। তখন কি করবো। তার পারিশ্রমিক টা তো দেওয়া উচিত। এভাবেই অনেক টাকা চলে গিয়েছে ডিজাইনারদের পেছনে। তো আমি কি করবো? ভোক্তা অধিকার এ কমপ্লেইন করবো!!
এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা একজন ক্রেতা হিসেবে আমারও আছে। তারপরও আমাদের অনলাইনে কেনাকাটা করতে হয়। ব্যস্ত জীবনে এটির বিকল্প কিছু হতেই পারে না। তবে হ্যা যে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করলাম আমাদের উচিত এগুলো সমাধানে আমাদের এগিয়ে আসা। আপনি আমি আমরাই পারি এই সেক্টরকে আরো স্ট্যান্ডার্ড পর্যায়ে নিয়ে যেতে। অবশ্যই কেনার আগে ঐ প্রতিষ্ঠানের রিভিউ দেখে নেওয়া উচিত। আমরা যারা উদ্যোক্তা আছি আমাদেরও উচিত ই- কমার্সের যত অপবাদ আছে সেগুলো দূর করা। একদিন আমরাও চায়নার মত এই সেক্টরকে ১ নম্বরে নিয়ে আসবো ইনশাল্লাহ।
Sabbir Ahm