05/11/2019
তাং: ১২/০৪/২০১৯ খ্রি.
অনুরাধা,
কেমন আছো? কোথায় আছো? খুব জানতে ইচ্ছা করে এখনো কি পায়ে আলতা দিয়ে বৃষ্টির জলে হাঁটো! তুমি পায়ে আলতা দিলে অপূর্ব লাগে। সত্যি তুমি বিধাতার এক অপরুপ সৃষ্টি।
তোমায় আমি এই শহরে অজস্র নারীর ভীড়ে খুঁজে পেয়েছিলাম। তুমি অনন্য এক উপমাহীন। তোমার সৌন্দর্যের উপমা আমি আজও খুঁজে ফেরি।
জানি না, তোমার কাছে এই চিঠি পৌঁছাবে কিনা? তবুও তোমাকে লিখছি। যদি তোমার কাছে কখনো এই চিঠি পৌঁছায় তবে চিঠিটা পড়ে নিও। আমি তোমায় আমার মনের কল্পনা শক্তিতে আবিষ্কার করেছিলাম প্রথম দেখায়। তুমি লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পড়ে, কাঁধে পাটের ব্যাগ ঝুলিয়ে , লম্বা চুলের বেনী দুলিয়ে গুণ গুণ করে রবীন্দ্র সংগীত গাইতে গাইতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলে। তখন টুপটাপ করে বৃষ্টিরাশি ভূপৃষ্ঠ ছুঁয়ে যাচ্ছিল আলতো স্পর্শে। তোমার আলতা রাঙা পা বৃষ্টির জলে স্নান করে এক অপূর্ব রূপ ধারণ করেছিল। আমি মুগ্ধ নয়নে তা অবলোকন করতে করতে তোমার পিছু পিছু কখন টিএসসি পার করে নীলক্ষেত পৌঁছে গিয়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ কানের কাছে গাড়ির হর্ণে আমি বাস্তবতা ফিরে পেলাম। গাড়ির ভেতর থেকে একটা লোক গাড়ির ক্লাস নামিয়ে আমায় পাগল বলে বকা দিচ্ছিল। আর বকা দেবারই কথা। এই বৃষ্টি মুখর দিনে একা একা পাগলের মতো মাঝ রাস্তা দিয়ে হাঁটলে তাকে লোকে পাগলই বলবে।
সেদিনের সেই পাগলামি গুলো মনে পড়লে বড্ড হাসি পায়।
পৃথিবী বদলে গেছে সেই সাথে মানুষের জীবনযাত্রার মানও। এখন আর মাটির কাপে ধোঁয়া উঠা চায়ের আসর জমে উঠে না রাস্তার মোড়ের টংয়ের দোকানে। তোমার মনে আছে অনুরাধা! তোমার সাথে আলাপ হওয়ার পর রোজ বিকেলে ক্লাস শেষে আড্ডা দিতে হাজির হতাম কানাই কাকার চায়ের দোকানে।
এখনও রোজ আড্ডা বসে চায়ের দোকানগুলোতে। তবে সেই মাটির কাপ আর চোখে পড়ে না।
আজ সত্যিই তোমায় কাছে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর আমার হৃদয়। আজ বারে বারে হৃদয়ের মাঝে চিনচিন ব্যথা অনুভব হচ্ছে।
মনে পড়ে যাচ্ছে সেই সব দিনের কথা। ঢাকার বাতাস ক্রমেই করুণ বিনা বাজাতে শুরু করেছে। চারদিকে থমথমে ভাব। গুমোট আকাশ, অন্ধকার রাত, এমন দূর্যোগের রাতে ঢাকায় নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালির উপর গুলি চালায় পাকবাহিনী। আমি আমার হল থেকে ছুটে গিয়েছিলাম তোমার হলের সামনে। তোমায় এক নজর দেখে মনে শান্তি পেয়েছিলাম।
পরের দিন ভোর বেলা ২৬ই মার্চ ১৯৭১, কানাই কাকার চায়ের ছোট্ট দোকানটিতে হাজার মানুষের ভীড়।
চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রটি পাঠ করলেন। হাজার হাজার মানুষ এক যোগে বলে উঠল 'জয় বাংলা'।
দেশের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে লাগলো। তোমায় অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়ি পাঠালাম।
যাবার আগে তুমি বায়না ধরলে মাথায় সিঁদুর দিয়ে হাতে শাখা পলা পরিয়ে দিতে হবে।
মন্দিরে গিয়ে শাখা পলা পরিয়ে তোমার মাথায় সিঁদুর দিলাম। তুমি আমায় শেষ বারের মতো প্রণাম করে নিলে। আমি তোমার কপালে জ্বলজ্বল করা লাল টিপের পাশে আলতো করে চুমু দিলাম। তুমি লজ্জায় আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে রইলে কিছুক্ষণ। তারপর মন্দির থেকে সোজা গাবতলি এসে উত্তর বঙ্গের বাসে তোমায় তুলে দিয়ে বিদায় নিলাম।
তোমায় কথা দিয়েছিলাম, মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করে তোমায় নিয়ে মায়ের কাছে যাবো।
টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে তোমার গ্রামে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি আমার কথা রেখেছিলাম অনুরাধা। তুমি কথা রাখোনি। তুমি তো বলেছিলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে। তবে কেন আমায় ফাঁকি দিলে অনুরাধা?
আকাশ ফাটিয়ে গগন কাঁপিয়ে যখন তোমার নাম ধরে চিৎকার করছিলাম তখন একটা ছেলে এসে জানিয়েছিল, লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পড়া অনুরাধার লাশ বহুদিন ইছামতীর জলে ভেসেছে। ভয়ে কেউ লাশে হাতও দেয়নি শুধু দূর থেকে দেখে এসেছে।
অনুরাধা তুমি মিশে আছো এই বাংলার জল,মাটি, বাতাসে। আমি আজও শুনতে পাই তোমার লজ্জা রাঙা নিশ্বাসের শব্দ। আমি এই বাংলার জলে আজও দেখি তোমার পা ধোঁয়া আলতা।
অনুরাধা আজ আর লিখতে পারছি না। আসলে বয়স তো আর কম হলো না! মন চায় এখনও অনেক কিছু কিন্তু শরীরটা যে আর নিতে পারে না। তাছাড়া ছেলের বউ সেই কখন ঔষধ দিয়ে গেছে। আবার এসে যদি দেখে আমি এখনও বসে আছি তাহলে খুব বকা দিবে। মেয়েটা অনেকটা তোমার মতো। আমায় বড্ড ভালোবাসে আবার শাসনও করে। তাই আজ আর না। যেখানেই থাকো ভালো থেকো।
ইতি
তোমার অর্ণব
লেখা : অনন্যা অনু