06/05/2020
গৌতম বুদ্ধ। আজ হতে আড়াই হাজার বছরেরও আগে খ্রীষ্টপূর্ব ৬২৪ অব্দে এমন এক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে নেপালের লুম্বিনী কাননে কপিলাবস্তু রাজ্যের রাজা শুদ্ধোধন ও রাণী মহামায়া'র সন্তান হয়ে এই পূণ্যপুরুষের জন্ম। রাজা শুদ্ধোধন শিশুর জন্মের পঞ্চম দিনে নামকরণের জন্য আটজন ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ জানালে তারা শিশুর নাম রাখেন সিদ্ধার্থ অর্থাৎ যিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন। এই সময় পর্বতদেশ থেকে আগত অসিত নামে একজন সাধু সিদ্ধার্থকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেন- এই শিশু পরবর্তীকালে একজন রাজচক্রবর্তী অথবা একজন সিদ্ধ সাধক হবেন। একমাত্র সর্বকনিষ্ঠ আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন- এই শিশু পরবর্তীকালে বুদ্ধত্ব লাভ করবেন।। বিবিধ শিক্ষা দীক্ষায় পরিপূর্ণ হয়ে শৈশব, কৈশর পার করে রাজ্যের রাজপুত্র সেই শিশু সিদ্ধার্থ। যৌবনে গিয়ে রাজ্যের আবদ্ধতা থেকে বের হয়ে সিদ্ধার্থ জানতে পারেন দুঃখ, ব্যাধি, মৃত্যু'র মতন মনুষ্য জন্মের কয়েক চিরন্তণ বাস্তবতার এবং উপলব্দি করেন সন্ন্যাসীত্বই একমাত্র মুক্তির উপায় সন্ধানের পথ। তিনি উদগ্রীব হতে থাকেন এসব চিরন্তণ সত্যের বিশ্লেষণে। এরই মধ্যে যশোধরা গোপা'র সাথে বৈবাহিক সূত্রে বাঁধা পড়েন কপিলাবস্তুর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। তাঁদের ওরশে জন্ম নেয় পুত্রসন্তান- রাহুল। কিন্তু এই রাজ্যবৈভব, ঐশ্বর্য, স্ত্রী'র ভালোবাসার মোহ, পুত্রের মায়া কোনো কিছুই তাঁকে জগতের দুঃখ মুক্তির উপায় খোঁজার তাড়না হতে নিষ্কৃতি দিতে পারেনি। তাই জীবনের ২৯তম বছরে গিয়ে তিনি গৃহত্যাগ করেন। রাজপুত্রের বিত্তবৈভব ছেড়ে আসা সেই সিদ্ধার্থ বোধীবৃক্ষ তলে ছয় বছর ঊনপঞ্চাশ দিন কঠোর ধ্যান, সাধনার মধ্য দিয়ে তাঁর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে গিয়ে খ্রীষ্টপূর্ব ৫৮৯ অব্দে এমন আরেক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে লাভ করে সম্যক সম্বুদ্ধত্ব জ্ঞান। সিদ্ধার্থ জীবনের অবসান ঘটিয়ে পরিচয় হয় গৌতম বুদ্ধ নামে। বুদ্ধত্ব জ্ঞান লাভের পর জগতে মানবতার মুক্তির কল্যাণে দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর জ্ঞান-দর্শন প্রচার করে খ্রীষ্টপূর্ব ৫৪৪ অব্দে জীবনের আশি বছর বয়সে এসে ভারতের কুশিনগরে ঠিক আরেক বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন মহাকারুনিক সম্যক সম্বুদ্ধ।
আজ বৈশাখী পূর্ণিমা, গৌতম বুদ্ধের ত্রি-স্মৃতি বিজরিত বলে বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে যা সমাদৃত। যে কারণে আজকের দিন গোটা বিশ্বে বিশেষ করে বৌদ্ধদের কাছে ভীষণ তাৎপর্যের।
গৌতম বুদ্ধকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। কারণ- বুদ্ধের জ্ঞান ও বিজ্ঞান ইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষ ও উপলদ্ধি করা ঘটনাপ্রবাহ বা জ্ঞান ছাড়া কিছুই মানেনা। তবে বুদ্ধের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে, বুদ্ধের জ্ঞানে মন বা চিত্তসহ ছয়টি ইন্দ্রিয় আছে আর বিজ্ঞানে আছে পাঁচটি। বিজ্ঞানে অধিবিদ্যা বা ইন্দ্রিয় অতিরিক্ত জ্ঞানের কোন স্থান নেই। বুদ্ধের জ্ঞানেও অধিবিদ্যা বা ইন্দ্রিয় অতিরিক্ত জ্ঞানের কোন স্থান নেই, তবে বুদ্ধের জ্ঞান বিদর্শন ভাবনার মাধ্যমে চিত্ত দিয়ে যা প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধি করে তা বিজ্ঞানের পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধ করা জ্ঞান থেকে অনেক অনেক এগিয়ে এবং সম্পূর্ণ আলাদা। বুদ্ধের মৌলিক দর্শন বা ধর্ম (‘রিলিজিয়ন’ বা প্রচলিত ‘ধর্ম’ অর্থে নয়), অর্থাৎ প্রতিঠীত্যসমুদপাদ-কর্মবাদ-জন্মান্তরবাদ, চতুরায্য সত্য, অষ্টাঙ্গিকমার্গ ও নির্বাণ- এই জ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই জ্ঞান পৃথিবীতে একমাত্র বুদ্ধই প্রথম সম্যকভাবে প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধি করেছিলেন। এখানেই বুদ্ধের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব”।
যে চলচ্চিত্রটির লিংক নিচে দেয়া সেটি ১৯৯৩ সালে Bernardo Bertolucci এর পরিচালনায় আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় মহামানব গৌতম বুদ্ধ'র জীবনী নিয়ে নির্মিত অন্যতম চলচ্চিত্র। দেখে নিতে পারেন।
আর জগতের এমন দুঃসময়ে আবারও প্রার্থনা- জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করুক।
সুরক্ষিত থাকুন, সামর্থ্যের যতটুক সম্ভব আশপাশের মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসুন, যত্নে থাকুন।
বুদ্ধ পূর্ণিমা'র শুভেচ্ছা...